চুমকির জন্য

১.
অনেক কষ্টে চুমকিকে রাজি করালো মাহিন তার সাথে চাইনিজে যেতে। হুড তোলা রিকশায় বসতে গিয়ে গায়ে গা যেন না ছোঁয় সেদিকে মাহিনের খেয়াল বেশী।
পাবলিক লাইব্রেরি থেকে কাঁটাবন বেশি দূরে না। মুহূর্তে পথ ফুরায় আর ছেলেটা ভাবে ধেৎ এখুনি নামতে হবে !

মাস্কো সুজের মোড়ে ‘টাইকিং’ চাইনিজটা নতুন হয়েছে। হলের ছেলে বলে মালিক ম্যানেজার সবাই মাহিনকে সালাম দেয়। আজ বুক চিতিয়ে না ঢুকে চোরের মত চুপিসারে চুমকিকে নিয়ে একটা অন্ধকার কোনায় গিয়ে বসলো।

চুমকিকে জিজ্ঞেস করলো – কি খাবে ?

উত্তর দেয় – আমি জানি না। আগে কখনো খাই নাই।

– ওহ আচ্ছা।

পকেটে বেশি টাকা নাই। রুমমেটের মানিব্যাগ হাতড়ে একশোটা টাকা পেয়ে সেটা নিয়ে এসেছে।
মেন্যু দেখার দরকার নাই। হট এন্ড সাওয়ার স্যুপ,ফ্রাইড চিকেন আর ভেজিটেবল রাইস অর্ডার দিলো।
মেয়েটা কিছু খাচ্ছে না। গ্লাসে ঢেলে দেয়া কোকে স্ট্র দিয়ে একটু করে খাচ্ছে যেন পাখির খাবার।

বন্ধুরা সহ এলে খাবার সাবাড় হয় নিমিষে। পারলে ভাতের হোটেলের মত ওয়েটারকে ঢেকে বলে আরেকটু ‘এমনি’ খাবার দিতে। আজ তার গলা দিয়েও কিছু নামছে না।

চুমকি হঠাৎ বলে – মাথা ব্যথা করছে। বাসায় যাবো।

ওয়েটারকে ডেকে বিল দিতে বলে মাহিন। সব খাবার পড়ে আছে। ওয়েটার জানতে চায় প্যাকেট করে দেবে কিনা। মাহিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথা নাড়ে। এত দামের খাবার ফেলে যেতে বুক ফেটে যাচ্ছে।

ম্যানেজার বিল কমিয়ে দিয়ে পাঠালো। মাহিন সেটা বুঝে তার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালো নীরবে। তারপর চুমকিকে নিয়ে বেরিয়ে এলো।

অনেক মাথা ব্যথা করছে – বলে চুমকি।
রিকশায় উঠলো ওরা। শাহবাগে যেতে বলে। ফুটপাথে থেমে মাহিন নেমে গিয়ে সিলভানা থেকে দুইটা ফাইটামল কিনে আনলো। চুমকির হাতে দিয়ে বলে – খেয়ে নাও। মাথা ব্যথা কমে যাবে।

– এখন না, বাসায় গিয়ে খাবো। আমি যাই।

– কাল ক্যাম্পাসে আসবে তো !

– আমি জানি না। বাই।

মাহিন ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চুমকিকে নিয়ে চলে যাওয়া রিকশার দিকে তাকিয়ে রইলো। রিকশার পেছনের আঁকা ছবিটার পাশে লেখা – কেউ কারো নয়।
আরে তাইতো, কেউ কারো না।

সব ভুয়া। ফুটা কপাল আমার।
এত্তগুলি টাকার খাবার কেন ফেলে এলো এই কথা ভাবতে ভাবতে মনের দুঃখে সে হলের দিকে হাঁটা শুরু করলো।

২.

চাইনিজ খাইয়ে, মাথা ব্যথা কমাতে ফাইটামল কিনে দিয়েও মনে হল না মেয়েটার মন গলানো গেছে। এই একটা ব্যাপারে বড় বেশী লাজুক ছেলেটা। মেয়েদের সামনে গেলে জবান বন্ধ হয়ে যায়। অথচ বন্ধু মহলে তার গলার স্বর সবচেয়ে উঁচু।
মন তো গলানোই পড়েগা। মাগার ক্যায় সে !

একদিন যাওবা সুযোগ পেয়েছিল রিকসায় উঠার, চাইনিজে নেয়ার – কিন্তু তাতে কোন লাভ হয় নাই। কেউ একটা কথাও কইতে পারে নাই। নিরুপায় কিন্তু বেপরোয়া বেচারা মাহিন শেষে বন্ধুদের কাছে ধর্না দেয়। তার বন্ধুরা হল সব মারদাঙ্গা হনুমান। প্রেমিক পুরুষ না একটাও। লাভ হচ্ছে না।

এনেক্সের মেয়ে বন্ধুগুলি আরও বড় মাস্তান। চুমকি মাহিনকে পাত্তা দেয় না বলে লাভলী নিরু এগনেস একদিন চুমকির ডিপার্টমেন্টে হানা দিয়ে নানা কটু কথা বলে থ্রেট করে গেলো। মাহিনের সাথে না ঘুরলে নাকি ক্যাম্পাস ছাড়া করে দেবে।
হায় হায়, এটা করে ওরা সব আরও লেজে গোবরে করে ফেললো। আশার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিলো আর কি !

ওদেরকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে মাহিন – তোমাদেরকে কে বলছে ওরে থ্রেট করতে ?

ওরা সরি না হয়ে উল্টা তেজ দেখিয়ে উত্তর দেয় – নিজে বিলাইর মত ম্যাও ম্যাও করে আর আমরা হেল্প করতে চাইলাম সেজন্য থ্যাংকস না দিয়ে উল্টা ঝারি মারতে আসে। ভাদাইম্যা কোনহানকার !

দ্যাকলেন অবস্তাটা !

চুমকির কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। চারটা দজ্জাল বান্ধবী ওকে সারাক্ষণ ঘিরে রাখে। একসাথে ক্যাম্পাসে ঢোকে। একসাথে ঘুরে। একসাথে বিদায় হয়।

অভাগা যেদিকে তাকায়, সাগর সব সময় না হুগায়া গিয়া মাঝে মইধ্যে এট্টূ পানিও ঢাইলা দেয়।

মাহিনের এক চিকন বুদ্ধির বন্ধুর চিকন বুদ্ধিতে একদিন কেমন কেমন করে ওরা রাজী হয়ে গেল মাহিনের দলের সাথে পিকনিকে যেতে।

রাজী হলে কি হবে, যাওয়ার গাড়ী পাবে কোথায় !

নীলক্ষেতের আল-আমিনে বসে কেউ গাড়ির কোন ব্যবস্থা না করতে পেরে যখন চুল ছিঁড়ছিল ভোম কালা মটূ ম্যানেজার আলী ভাই এগিয়ে এসে বলে – এত ভাবনের কাম কি ! একটা টেম্পু লইয়া যান গিয়া।

বলে কি, টেম্পুতে পিকনিক ! ইতিহাস হয়ে যাবে যে !

আলী ভাই তার রেস্তোরাঁর সামনে লাইন ধরে দাঁড়ানো টেম্পুগুলির একটাকে ডেকে বলে দিলো।

ড্রাইভার বুক চিতিয়ে বলে – আমার টেম্পু পুরা পংখীরাজ কইলাম। ছুটেও সেইরাম। কইলে চান্দের দ্যাশেও লইয়া যাইতে পারুম।

সব ঠিকঠাক। এক ছুটির দিনে সবাই এসে জড়ো হল মসজিদের পাশে। ওরা চারজন। মাহিন ও তার তিন বন্ধু। মোট আটজন।

টেম্পু দেখে মেয়েরা পুরা বিগড়ে গেল। জানিয়ে দিলো কোনভাবে তারা টেম্পুতে চড়বে না। ইজ্জত নাকি হাফসুল হয়ে যাবে।
আবার সেই চিকন বুদ্ধির বন্ধু এগিয়ে এলো উদ্ধার করতে। বলে – সবাই পিকনিকে যায় গাড়িতে, ট্রাকে আর না হয় বাসে। আমরা না হয় ব্যতিক্রম কিছু করে দেখাই। তোমরা গিয়েই দেখো না কেমন লাগে।

অনেক বুঝিয়ে রাজী করিয়ে সবাই মিলে টেম্পুতে উঠলো। আটজন মানুষ প্রায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে হল। মাহিনের ইচ্ছা চুমকির পাশে বসার। আশা পূরণ হল না। মেয়েরা একদিকে আর ছেলেরা অন্যদিকে বসলো।

টেম্পু ফটফট আওয়াজ তুলে ছুটলো মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে।

৩০শে নভেম্বর, ২০১৯